প্রবন্ধঃ স্বাধীনতাত্তোর বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা ভাবনা ও বর্তমান প্রতিফলন-মাসুদ রানা প্রবন্ধঃ স্বাধীনতাত্তোর বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা ভাবনা ও বর্তমান প্রতিফলন-মাসুদ রানা – দৈনিক পাবনা
  1. admin@dainikpabna.com : admin :
  2. rakibhasnatpabna@gmail.com : Rakib Hasnat : Rakib Hasnat
শুক্রবার, ০৭ অক্টোবর ২০২২, ০২:৫৪ পূর্বাহ্ন
শুক্রবার, ০৭ অক্টোবর ২০২২, ০২:৫৪ পূর্বাহ্ন
ব্রেকিং নিউজ :

প্রবন্ধঃ স্বাধীনতাত্তোর বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা ভাবনা ও বর্তমান প্রতিফলন-মাসুদ রানা

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • আপডেট সময় : ৪ মাস আগে
  • ১২৯ বার পঠিত

একটি জাতি গঠন ও তার উত্তোরত্তর উন্নয়নের সোপান ই হলো সে জাতি বা রাস্ট্রের শিক্ষা ব্যবস্থা । যুদ্ধ পরবর্তীতে একদিকে যেমন বিধ্বস্ত বাংলাদেশে ক্ষুধা ও দারিদ্র মুক্ত করার লড়াই করেছেন বঙ্গবন্ধু ঠিক ভেতর ভেতর তিনি ভবিষ্যৎ উন্নয়নে শিক্ষার কোন বিকল্প নেই এই অনুধাবন করেছিলেন। কারন দেশ বিভাগ পরবর্তী তথা ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত যে ৬ টি কমিশন গঠন করা হয়েছিলো সেসব কমিশনের রিপোর্টে অখন্ড এ অংশে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় চরম বৈষম্যই লক্ষ্য করা যায় । তাই তো তিনি বাংলাদেশের উন্নয়নে শিক্ষা ব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর চিন্তা করেন।


১৯৭০ সালে নির্বাচনী বক্তৃতায় বঙ্গবন্ধু সুষ্ঠু সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য শিক্ষা খাতে বিনিয়োগকে উৎকৃষ্ট বিনিয়োগ বলে অভিহিত করেন। শিক্ষা সম্বন্ধে নীতিনির্ধারণী এ বক্তব্যে তিনি বলেন, সু-সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য শিক্ষাখাতে বিনিয়োগের চাইতে উৎকৃষ্ট বিনিয়োগ আর কিছু হতে পারে না। ১৯৪৭ সালের পর এ দেশে প্রাথমিক স্কুলের সংখ্যা হ্রাস পাওয়ার পরিসংখ্যান একটি ভয়াবহ সত্য। আমাদের জনসংখ্যার শতকরা ৮০ ভাগ অক্ষরজ্ঞানহীন। প্রতি বছর ১০ লক্ষেরও অধিক নিরক্ষর লোক বাড়ছে। জাতির অর্ধেকেরও বেশি শিশুকে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। শতকরা মাত্র ১৮ জন বালক ও ৬ জন বালিকা প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করছে। জাতীয় উৎপাদনের শতকরা কমপক্ষে ৪ ভাগ সম্পদ শিক্ষা খাতে ব্যয় হওয়া প্রয়োজন বলে আমরা মনে করি। কলেজ ও স্কুল শিক্ষকদের, বিশেষ করে প্রাথমিক শিক্ষকদের বেতন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করতে হবে। নিরক্ষরতা অবশ্যই দূর করতে হবে। ৫ বছর বয়স্ক শিশুদের বাধ্যতামূলক অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষাদানের জন্য ‘ক্র্যাস প্রোগ্রাম’ চালু করতে হবে। মাধ্যমিক শিক্ষার দ্বারা সব শ্রেণির জন্য খোলা রাখতে হবে। দ্রুত মেডিকেল ও কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয়সহ নয়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে হবে। দারিদ্র্য যাতে উচ্চশিক্ষার জন্য মেধাবী ছাত্রদের অভিশাপ হয়ে না দাঁড়ায়, সেদিকে দৃষ্টি রাখতে হবে। শিক্ষা ব্যবস্থার দিকনির্দেশনা প্রদান করার জন্য বিখ্যাত শিক্ষাবিদ বিজ্ঞানী ড. কুদরত-ই-খুদাকে সভাপতি করে ১৯৭২ সালের জুলাই মাসে ১৯ সদস্যবিশিষ্ট একটি শিক্ষা-কমিশন গঠন করা হয়। বঙ্গবন্ধুর একান্ত ইচ্ছায় ১৯৭৪ সালের মে মাসে একটি সুদূরপ্রসারি লক্ষ্য নিয়ে কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা-কমিশন প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। এই কমিশনে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল জাতির প্রত্যাশা আর বঙ্গবন্ধুর শিক্ষাদর্শন ও শিক্ষাভাবনা। কমিশনে প্রাথমিক শিক্ষার মেয়াদ ৫ বছর থেকে বাড়িয়ে ৮ বছর করার সুপারিশ করা হয়। উচ্চশিক্ষা গ্রহণেচ্ছুদের জন্য সাক্ষরতা অভিযান নামে বিশেষ একটি পদক্ষেপের কথা শিক্ষা-কমিশনে উল্লেখ করা হয়। ৫ বছরের মধ্যে ১১-৪৫ বছর বয়সী সাড়ে তিন কোটি নিরক্ষর মানুষকে অক্ষরজ্ঞান দেয়ার প্রস্তাব ছিল এই শিক্ষা-কমিশনে। অর্থাৎ শুধু নিজে শিক্ষিত হলে চলবে না, বরং নিরক্ষরদের শিক্ষিত করার মাধ্যমে সামাজিকতা তৈরি ও দেশ গঠনে অবদান রাখতে হবে। বঙ্গবন্ধু বলতেন ‘আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা এ পর্যন্ত শুধু আমলাই সৃষ্টি করেছে, মানুষ সৃষ্টি করেনি।’ তিনি মানুষ সৃষ্টিতে মনোনিবেশ করেন। শিক্ষা-কমিশনে মেধাবীদের জন্য বিশেষ ধরনের মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, অসচ্ছল বালক-বালিকাদের সরকারি বৃত্তি, ক্যাডেট ও রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুলে কারিগরি, সাধারণ ও বিজ্ঞান বিষয় অন্তর্ভুক্তির জন্য সুপারিশ করা হয়। বাংলাভাষাকে শিক্ষার মাধ্যম করে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত পঞ্চম শ্রেণি ও ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত অষ্টম শ্রেণির শিক্ষাকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক করার বিষয়ে তিনি গুরুত্বারোপ করেন। আইনের মাধ্যমে শিশুদের নাম ও জাতীয়তার অধিকারের স্বীকৃতি, সব ধরনের অবহেলা, শোষণ, নিষ্ঠুরতা, নির্যাতন, খারাপ কাজে ব্যবহারসহ সকল অপকর্ম থেকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তার আগ্রহে ১৯৭৪ সালের ২২ জুন ‘জাতীয় শিশু আইন’ জারি করা হয়। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রাথমিক শিক্ষাকে যুগোপযোগী করার লক্ষ্যে ১৯৭৩ সালে ৩৬ হাজার ১৬৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ এবং ১ লাখ ৫৭ হাজার ৭২৪ জন শিক্ষককে সরকারিকরণের মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষার অগ্রগতির সোপান রচনা করেন। পৃথিবীর ইতিহাসে এটি একটি বিরল ঘটনা। যদিও তখনকার আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিক টানাপড়েনের মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষাকে জাতীয়করণ ও বাস্তবায়ন ছিল একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ। কিন্তু ১৯৭৫ সালে ইতিহাসের জঘন্যতম হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যা করায় বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার পদক্ষেপ মুখ থুবড়ে পড়ে। এরই ধরাবাহিকতায় প্রাথমিক শিক্ষায় স্থবিরতা নেমে আসে। ড. কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশন আলোর মুখ দেখেনি। এরপর দীর্ঘ সময় প্রাথমিক শিক্ষাসহ শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে চলে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা। এ সময় বাস্তবসম্মত তেমন কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ে না।

১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনার সরকার প্রথমবার ক্ষমতা গ্রহণের পর শিক্ষা খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বাজেট প্রণয়ন করে। অবহেলিত প্রাথমিক শিক্ষা যেন আবার প্রাণ ফিরে পায়। প্রাথমিক শিক্ষার মান উন্নয়নে সময়োপযোগী ও কার্যকর বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। ২০০৯ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসে বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনার সরকার ‘জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০’ প্রণয়ন করে। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এর আলোকে একটি আধুনিক, বিজ্ঞানমনস্ক ও প্রযুক্তি জ্ঞানসম্পন্ন জাতি গঠনের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নপূরণে ‘ভিশন-২০২১’ শীর্ষক লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। এই ‘ভিশন-২০২১’-এ ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি মধ্যম আয়ের দেশ ও ২০৪১ সালের মধ্যে একটি উন্নত দেশে পরিণত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। আর এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিতে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া হয়। প্রাথমিক শিক্ষাকে আরও গতিশীল করার লক্ষ্যে ২০১৩ সালে তারই সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২৬ হাজার ১৯৩টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ করেন। এ সরকারের আমলে বিভিন্ন কার্যকর ও ফলপ্রসূ উদ্যোগ গ্রহণের ফলে প্রাথমিক শিক্ষা যেন আবার প্রাণ ফিরে পায়। তৈরি করা হয় নতুন শিক্ষানীতি। ২০১১ সালে এ সরকার প্রবর্তিত নতুন শিক্ষানীতি মূলত ড. কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশনের আলোকেই প্রণীত হয়।

বর্তমানে প্রাথমিক বিদ্যালয়সমূহে শতভাগ ভর্তি নিশ্চিতকরণ, একীভূত শিক্ষা ও প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা চালুকরণ, ২০১১ সাল হতে সম্পূর্ণ নতুন পাঠ্যপুস্তক বিনামূল্যে শিক্ষা-বছরের প্রথম দিনই ‘বই উৎসব’ এর মাধ্যমে তুলে দেয়া, নতুন ভবন নির্মাণ, পুনঃনির্মাণ, সংস্কার, নিরাপদ পানীয়জলের ব্যবস্থা, স্যানিটেশন ও ওয়াশব্লক স্থাপনসহ অবকাঠামোগত ব্যাপক উন্নয়ন সাধন এবং আরও নতুন নতুন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের মেধাযাচাই ও মূল্যায়নের জন্য ২০০৯ সাল হতে সারাদেশে অভিন্ন প্রশ্নপত্রের মাধ্যমে ‘প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী’ পরীক্ষা গ্রহণ, শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশের পাশাপাশি তাদের শারীরিক ও মানসিক উৎকর্ষ সাধন ও নেতৃত্বের গুণাবলী বিকাশের জন্য বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। যেমন- সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শতভাগ উপবৃত্তি প্রদান, মিড-ডে মিল চালু, স্টুডেন্ট কাউন্সিল গঠন, কাব-স্কাউট দল গঠন, ক্ষুদে ডাক্তার দল গঠন, প্রাক্তন শিক্ষার্থী অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন গঠন, বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব গোল্ডকাপ প্রাথমিক বিদ্যালয় ফুটবল টুর্নামেন্ট, জাতীয় পর্যায়ে আন্তঃপ্রাথমিক বিদ্যালয় ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা ইত্যাদি। ২০১৪ সালে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের জীবনমান, প্রশাসনিক উন্নয়ন ও সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধিতে প্রধান শিক্ষক পদটিকে দ্বিতীয় শ্রেণির গেজেটেড কর্মকর্তার পদমর্যাদায় উন্নীত করে যুগের চাহিদা মিটানো হয়। শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি ও প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোকে একাডেমিক সহায়তা প্রদানের জন্য উপজেলা পর্যায়ে উপজেলা রিসোর্স সেন্টার প্রতিষ্ঠা (ইউআরসি) করা হয়েছে। ২০১৩ সাল থেকে পিটিআইগুলোতে ধাপে ধাপে এক বছর মেয়াদি সিইনএড কোর্সের পরিবর্তে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতায় দেড় বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা ইন প্রাইমারি এডুকেশন (ডিপিএড) কোর্স চালু করা হয়েছে। আধুনিক ও মানসম্মত শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর জন্য প্রাথমিক শিক্ষক ও শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আইসিটি বেইজড বিভিন্ন প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে পর্যায়ক্রমে ল্যাপটপ ও মাল্টিমিডিয়া প্রদান করা হচ্ছে, পাশাপাশি ইন্টারনেট সংযোগ করে আইসিটি বেইজড শ্রেণিকক্ষ চালু করার উদ্যোগও গ্রহণ করা হয়েছে। বর্তমানে প্রাথমিক শিক্ষকেরা নিজেরাই ডিজিটাল কন্টেন্ট তৈরি করে শ্রেণী পাঠদান করতে পারছেন। প্রতি বছর প্রাথমিক শিক্ষা ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রাখার জন্য শ্রেষ্ঠ শিক্ষক ও কর্মকর্তাসহ তেরটি ক্ষেত্রে ‘প্রাথমিক শিক্ষা পদক’ প্রদান করা হচ্ছে। শ্রেষ্ঠ শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের কাজের স্বীকৃতি প্রদানের জন্য বৈদেশিক প্রশিক্ষণ ও শিক্ষা-সফরের সুযোগ করে দেয়া হয়েছে। এ সবই বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মাণে সবার জন্য মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিতকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ফলে প্রাথমিকে ভর্তির হার শতভাগে উন্নীত হয়েছে। ঝরে পড়ার হারও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে।
২০২০ সাল। মুজিববর্ষ। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী। মুজিববর্ষকে ঘিরে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছিল। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে নিরক্ষরতামুক্তসহ মোট ১৭টি কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছিল প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। এসব কর্মপরিকল্পনার মধ্যে ছিল ২০২০ সালের ৩১ আগস্টের মধ্যে দেশের সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বাংলা শোনা, বলা, পড়া. লেখায় শতভাগ দক্ষ করে তোলা। উপানুষ্ঠানিক ব্যুরোর মাধ্যমে দেশের ২১ লাখ নিরক্ষর মানুষকে সাক্ষরতা দান করা। ২০২০ সালের ৩১ অক্টোবর প্রাথমিক শিক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক, কর্মচারী ও কর্মকর্তার সমন্বয়ে জাতীয় পর্যায়ে ঢাকায় সমাবেশের আয়োজন করা।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে বেশ কিছু কার্যক্রম জোরালোভাবে শুরুও করা হয়েছিল। এর মধ্যে অন্যতম হলো- দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সকল শিক্ষার্থীকে ২০২০ সালের ৩১ আগস্টের মধ্যে বাংলা বিষয়ে দক্ষ করে গড়ে তোলা নিশ্চিত করা। তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বাংলায় শতভাগ দক্ষতা অর্জনের প্রয়াস নেয়া হয়েছিল গুরুত্ব সহকারে। আশা করা হয়েছিল মুজিবর্ষে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সকল শিশু তার বাংলা পাঠ্যবই ও সমমানের সম্পূরক পঠনসামগ্রী সাবলীলভাবে পড়তে পারবে। এ লক্ষ্যে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছিল। মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পরিবীক্ষণও করছিল।এছাড়া ইংরেজি বিষয়ে শিক্ষার্থীদের এগিয়ে নিতে ওয়ান ডে, ওয়ান ওয়ার্ড কার্যক্রম চালু হয়েছে।

এর মধ্যেই আমরা বিশ্ব মহামারী করোনার কবলে আক্রান্ত হই।সাম্প্রতিক বিশ্বের বহুল আলোচিত শব্দ বা বিষয় হলো করোনা। সারা বিশ্বে আবালবৃদ্ধবনিতার মুখে এই শব্দটি উচ্চারিত হয়েছে ভয়-আতঙ্ক-দ্বিধা ও নৈরাশ্য নিয়ে। বিশ্ববাসী এখনও জানে না এর শেষ কোথায়, কিসে এর থেকে মুক্তি মিলবে। আমরা সবাই এখন আতঙ্কগ্রস্ত ও দিশেহারা। দিন দিন যেন সময় কঠিন থেকে কঠিনতর হচ্ছে। দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে চিকিৎসা ব্যবস্থা, চাষাবাদ, সামাজিক বৈষম্য সব কিছু আজ হুমকির মুখে। করোনার আঘাত প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পড়েছে দেশ সমাজ ও মানবজীবনের প্রতিটি স্তরে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা। করোনাজনিত এ সংকটকালে আমরা আমাদের শিশুদের লেখাপড়ার দায়িত্বটা যথাযথভাবে পালন করতে পারছি না। বিগত ১৭ মার্চ ২০২০ খ্রি. হতে আমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো বন্ধ আছে। এ অবস্থায় বর্তমানে বিদ্যালয়সমূহ কোমলমতি শিশুদের শিখনে প্রত্যক্ষ কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না। ফলে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হতে চলেছে; যা কোনোভাবে কাম্য নয়। বিদ্যালয়গামী শিশুর পড়ালেখা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তেমনি হুমকির মুখে পড়েছে শিশুর প্রারম্ভিক শৈশবকালও। বেশিদিন শিক্ষালয়ে না যেতে পারা মানেই সামাজিকভাবে শিক্ষার ব্যত্যয় ঘটা। শুধু শিক্ষার্জন নয়, শিশুর মানসিক স্বাস্থ্য ও সামাজিক সম্পর্কের জন্যও সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে এ করোনা। একই সঙ্গে বার্ষিক পাঠ্যক্রম সম্পন্ন না হওয়ার বিষয়টি তো আছেই। পাশাপাশি মুজিববর্ষ উপলক্ষে গৃহীত বিভিন্ন কার্যক্রমও হুমকির মুখে পড়েছে। তারপরও বর্তমান শিক্ষাবান্ধব সরকার শিখন ঘাটতি কমাতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছেন ।প্রাথমিক শিক্ষার কৌশল নির্ধারণ, কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ, কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন, সকল পর্যায়ে যোগাযোগ রক্ষা এবং প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা প্রদানের নিমিত্ত বিভিন্ন টুলস প্রণয়ন ও অ্যাপসভিত্তিক অনলাইন কার্যক্রম চালু হয়েছে। কর্তৃপক্ষের নির্দেশনায় মাঠপর্যায়েও এসব অনলাইন কার্যক্রম চালু রয়েছে। মাঠপর্যায়ে গুগল মিট ও জুম অ্যাপস ব্যবহার করে নিয়মিত বিদ্যালয়, ক্লাস্টার ও উপজেলাভিত্তিক বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। শিক্ষকরা অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সবসময় যোগাযোগ রক্ষা ও প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদানে সচেষ্ট। ক্লাস্টার, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তারা বিভিন্ন অ্যাপসের মাধ্যমে নিয়মিতভাবে নিজেদের মধ্যে এবং প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন। বিদ্যালয়, স্থানীয়, উপজেলা বা জেলাভিত্তিক অনলাইন স্কুল কার্যক্রম চালু হয়েছে। সংসদ বাংলাদেশ টিভিতে কোমলমতি শিশুদের জন্য শ্রেণী কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ বেতারের মাধ্যমে ‘ঘরে বসে শিখি’ কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য উপজেলা রিসোর্স সেন্টারে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অনলাইন প্রশিক্ষণ কার্যক্রমও চলমান আছে। অনলাইন ক্লাস , ওয়ার্কশীট বিতরন সহ রিমেডিয়াল নানা কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে । গত ১২ সেপ্টেম্বর বিদ্যালয় খোলার পর নানা রেমিডিয়াল পদক্ষেপ গ্রহনের মধ্য দিয়ে বিদ্যালয়ে শ্রেণী কার্‍্যক্রম চালু রয়েছে।

বাঙালি জাতির মহান শিক্ষক ও দার্শনিক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শিক্ষা ভাবনায় ছিল মৌলিকত্ব, অভিনবত্ব ও বাস্তবিকতা। তার শিক্ষাদর্শন স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মাণের লক্ষ্য থেকে উৎসরিত। বঙ্গবন্ধুর শিক্ষাদর্শনের মূলে ছিল- শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ পুঁজি বিনিয়োগ করে বাংলার মানুষের মধ্যে গণতন্ত্র, দেশপ্রেম, জ্ঞান ও দক্ষতা, মানবতা, নৈতিক মূল্যবোধ জাগ্রত করে একটি বৈষম্যহীন, প্রগতিশীল, বিজ্ঞানমনস্ক, অসাম্প্রদায়িক ও নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মাণের অমূল্য নির্দেশনা।‘সোনার বাংলা’ গড়তে তিনি যে সুদূরপ্রসারি কর্মযজ্ঞের সূচনা করেছিলেন- এর মাধ্যমে বাঙালির হৃদয়পটে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন এই মহান নেতা। আজকের এই প্রাথমিক শিক্ষা জাতির পিতারই শিক্ষাদর্শন ও শিক্ষা ভাবনার ফসল। তাই মুজিববর্ষে তার প্রতি সম্মান প্রদর্শনস্বরূপ মুজিববর্ষকে ঘিরে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় যেসব কর্মসূচি হাতে নিয়েছিল; বিশ্ব মহামারী করোনার জন্য একটু দেরিতে হলেও আমরা সেগুলো সফল করব- এই হোক আমাদের প্রত্যাশা

মোঃ মাসুদ রানা
সহকারী শিক্ষক, চরভবানীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পাবনা সদর,পাবনা।

এ জাতীয় আরও খবর

ফেসবুকে আমরা

© স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২২ দৈনিক পাবনা
Themes Customized By Shakil IT Park